শান্তি সন্ধানে কোরিয়ানদের স্বেচ্ছা-কারাবাস ও স্বস্তিহীন পৃথিবী

শান্তি সন্ধানে কোরিয়ানদের স্বেচ্ছা-কারাবাস ও স্বস্তিহীন পৃথিবী

Last Updated on 6 months by Probin Islam

শান্তি সন্ধানে কোরিয়ানদের স্বেচ্ছা-কারাবাস ইতিমধ্যেই আমাদের মাঝে বিচরণ শুরু হয়েছে। প্রতি রাতে অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে নিজেদের কারাগারে স্বীয়-বন্দিত্বের মাধ্যমে তাদের শান্তি আর স্বাধীনতার প্রতি তাদের তৃঞ্চা ‘স্বাধীনতা’ কে ব্যাখ্যার এক নতুন বিবেচনার সৃষ্টি করেছে। কারো কারো কাছে বন্দিত্ব সব সময়ই মন্দ কিছু নই যখন উদ্দেশ্য হয় আত্ম-নিঃসৃত।

কারাগার ভয়ানক, ভয়ঙ্কর আর মানুষের জন্য এক অপ্রত্যাশিত জায়গা। অনেক সময় স্বাধীনতা আর ব্যক্তিগত বা জাতীয় সার্বভৌমকে এই জায়গাটির সাথে বিবেচনা কারে বোঝানো হয় যেখানে নিপীড়ন, নির্যাতন আর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সাথে করা হয় দুর্ব্যবহার। মানুষ, সে একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসী হয়ে থাকলেও, তার জীবনকে পূর্ণতায় উপভোগের জন্য প্রয়োজনীয় সকল কিছু সরবরাহ পেলেও কখনো সে কারাগারে সময় ব্যয় করতে চাইবে না।

কারণ বন্দিত্ব বা কারাভোগ উপভোগের জন্য বা নিজের স্বীয় সত্ত্বাকে চিহ্নিত করার স্থান নয়। অধিকন্তু, কোন ব্যক্তি তার প্রয়োজনীয় সবকিছুর সরবরাহ পাওয়ার পরও যদি তাকে সীমিত স্থানে অবস্থান বা বিচরণ করতে হয় বা তার চলাফেরার স্বাধীনতা খর্ব করা হয় তার পরও সে তার বন্দিত্বকে উপভোগ করবে না।

জেল শাস্তি আমাদের সংশোধনের জন্য। এতে যে যায় ও বাস করে তাকে কলঙ্কিত করে। যে কোন উপায়ে মানুষ বন্দী বা কারাভোগে এড়িয়ে যেতে চাইবে। যাইহোক, গ্রীক দার্শনিক, যেমন প্লেটো জরিমানা দিতে ব্যর্থ এমন অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের ধারণার উন্নতি ঘটিয়েছিলেন । তবে রোমানরাই প্রথম কারাগারকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা শুরু করে।

তীব্রতা এবং অপরাধের আকৃতির ভিত্তিতে অপরাধীদের বিভিন্ন শর্তে ও অবস্থায় শাস্তি দেওয়া। তবে কারাগারের নিষ্ঠুরতম শাস্তির রূপটি হলো অপরাধীকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয় বা একাকীত্বে রেখে দেওয়া, যেখানে মানুষের সাথে তার যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয় না এবং সামাজিকীকরণ থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে তাকে জীবনযাপন করতে হয়। এই একাকীত্ব কি যে বেদনাদায়ক ও ভয়ঙ্কর তা দেখা যায় হলিউডের অন্য একটি চলচ্চিত্র Bridge on the River Kwai তে।

অসংখ্য ছবিতে আমি দেখেছি কীভাবে মানুষকে পুরো নির্জনতার মধ্যে ফেলে দিয়ে শাস্তি দেওয়া হয়। কেউ কেউ যখন মানুষের সহচার্য আর অনুষঙ্গকে বিশৃঙ্খল, বিরক্তিকর এবং ব্যক্তিগত অবস্থানে আক্রমণ এবং যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে বিবেচনা করলেও, জোরপূর্বক বিচ্ছিন্নতা হয় আরও যন্ত্রণাদায়ক। তাই, মানুষ কারাগার ভেঙ্গে কয়েদিদের অকল্পনীয় পদ্ধতিতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে অসংখ্যবার।

আমেরিকান টিভি সিরিজ Prison Break টি কীভাবে মানুষ তাদের নিজের জীবন বাজি রেখে হলেও হন্যে হয়ে কারাগার থেকে মুক্তি পেতে পারে তার একটি বিশুদ্ধ চিত্রায়ন। Orange Is the New Black টিভি সিরিজের বন্দীরা একে অপরের প্রেমে পড়ে, বিয়ে করে এবং কারাগারের অভ্যন্তরে একে অপরের যত্ন নেয় আপনার সহ-বন্দিরা আপনার কারামুক্তিতে কেঁদে ফেলছেন এবং নতুন করে অপরাধে আপনার কারাগারে ফিরে আসা দেখে খুশিতে আত্মহারা হতে দেখা কতইনা অবাক করার মতো?

কারাগারে, কেউ কেউ তাদের চরিত্রকে সংশোধন করে আবার কেউ আরও বেশি হিংস্র হয়ে ওঠে। যতই আরামদায়ক হোক না কেন কারাগার সবসময়ই কারাগার। ১৩ শ শতাব্দীর পর থেকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে মোট ৬৪৮ বার কয়েদিদের কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে এবং ২০ জন অপরাধী একাধিকবার পালাতেও সক্ষম হয়েছে। The Roman Empire এ গ্ল্যাডিয়েটররা নিজেদের মুক্ত নাগরিক হিসেবে হওয়ার জন্য তাদের জীবন বাজি রাখতে দেখা যায়। সাম্রাজ্যের ক্রমাগত নির্যাতনের মাঝে বসবাস করার চেয়ে তাদের পক্ষে মৃত্যুই শ্রেয় ছিল যেখানে রাজ্য নিজেই একটি কারাগারের ভূমিকা বজায় রাখত।

তবে কারাগার কেবলই এমন জায়গা নয় যেখানে রাষ্ট্রের ন্যায় বিচারের দরুন আপনি কারাবরণ করবেন , এটি এমনও জায়গা যেখানে অসংখ্য মানুষ প্রস্ফুটিত হয়েছে, জ্ঞানী হয়ে ওঠেছে আর লেখনীর মাধ্যমে হয়ে ওঠেছে প্রভাবশালী। কারাগারে থাকাকালীনই মহাত্মা গান্ধী তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী কাজ Hind Swaraj রচনা করেছিলেন।

কোরিয়ানদের শান্তির সন্ধানে স্বেচ্ছা-কারাবাস’এর সূত্রে বলতে গেলে, আপনি যখন অনুধাবন করতে পারেন যে কারাগারই এমন একটি জায়গা যেখানে আপনি আপনার অস্তিত্ব, পরিচয়, শান্তি এবং পরিবারের সন্ধান পান। প্রকৃতপক্ষে, কারও কারও কাছে এটি এমন একটি জায়গা যেখানে কংক্রিটের শহর থেকে দূরে অবস্থানে মনের শান্তি অর্জন করা সম্ভব। তাদের কাছে এটি এমন এক স্থান যা হতে পারে অধিকতর বাসযোগ্য ও প্রত্যাশিত।

কুখ্যাত বা প্রখ্যাত ব্রিটিশ বক্সার বিলি মুরের জীবনের উপর ভিত্তি করে নির্মিত, ২০১৭ সালের হলিডের চলচ্চিত্র A Prayer Before Dawn দেখায় যে থাইল্যান্ডের কারাবন্দি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মুরের সবচেয়ে যে জিনিসটি প্রয়োজন ছিল তা হলো তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি বিজয় । আর লড়াইটি এমন একটি এমন এক মরণমূখি লড়াই ছিল যে শেষ পর্যন্ত তাকে অনক দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকতে হলো।

লড়ায়ের পরে বিজয়ী মাদকাসক্ত বক্সারকে ব্রিটিশ কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল এবং ২০১০ সালে মুরকে রাজার সাধারণ ক্ষমাতে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

১৯৯৪ সালের হলিউডের The Shawshank Redemption ছবিতে একজন অপরাধী, অ্যান্ডি ডুফ্রেসন Shawshank কারাগার থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। অ্যান্ডি কারাগারের প্রাচীরের ভেতর দিয়ে একটি সুড়ঙ্গ তৈরির করে ৫০০ গজ পয়ঃনিষ্কাশণ পাইপের মাধ্যমে তার স্বীয় স্বাধীনতার পানে যাত্রা করেছিলেন। আরেক কারাবন্দি, রেড, ৪০ বছর কারাবাসের পর, পুনর্বাসনের শর্তে Shawshank থেকে মুক্তি পান।

কিন্তু কারাগারের বাইরে কঠোর বাস্তবতা মোকাবেলা করার অক্ষমতা, যেখানে কোন কিছুই তার কাছে অর্থবহ মনে হয়নি, রেড তার সাময়িক মুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করতে চেয়েছিলেন যাতে কর্তৃপক্ষ তাকে পুনরায় কারাগারে ফেরত পাঠায় যেখানে তার জন্য সবাই রয়েছে এবং রয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ। “যেখানে সবকিছু অর্থবহ আমি সেখানে ফিরে যেতে চেয়েছিলাম”, রেড বলেন, “যেখানে আমাকে সারাক্ষণ ভয় পেতে হবে না”। সাময়িক মুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে রেড দেশের সীমানা অতিক্রম করে অ্যান্ডির সাথে একত্রিত মিলিত হয়।

হুবহু না হলেও একই রকম একটি ঘটনা দক্ষিণ কোরিয়ায় ঘটেছে যেখানে জনগণ কারাগারে থাকার জন্য প্রতি রাত্রে ৯০ ডলার করে পরিশোধ করে থাকে। অপ্রচলিত শোনালেও সত্যি যে, মানসিক চাপে ভারাক্রান্ত শ্রমিক এবং শিক্ষার্থীরা শহরের বিশৃঙ্খল থেকে দূরে নির্জনে থাকতে স্বেচ্ছায় কারাবাস বেছে নেয়। “হাস্যকর যদিও”, বলেন পার্ক হাই-রি, এক ২৮ বছর বয়সী স্বেচ্ছায় কারাগাবাসে অংশগ্রহণকারী মহিলা , “ আমার মনে হয় জেল আমাকে স্বাধীনতার অনুভূতি দিচ্ছ ”। এখানে যে কোন ধরণের যোগাযোগের মাধ্যম যেমন মোবাইল ফোন, ঘড়ির উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যা তাদেরকে ব্যস্ত জীবন থেকে একটু দূরে রাখে।

যদি ‘শান্তি সন্ধানে কোরিয়ানদের স্বেচ্ছা-কারাবাস’ এর মতো ঘটনা যদি বিশ্বজুড়ে পুনরাবৃত্তি হয় তবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মানুষের পক্ষে বৃহত্তর শান্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কি আশা আছে? মানুষ কেন একা থাকতে চায়?

যখন কোনও কারাগার কাউকে শাস্তি দেওয়ার জন্য কারাবন্দি করে তার স্বাধীনতা খর্ব করা হয়ে থাকে অনেকের কাছে নিন্দনীয়, অগ্রহণযোগ্য এবং আপত্তিজনক হয়, এই কোরিয়ানরা প্রকৃত পক্ষে তাদের অর্থ-পরিশোধে কারাগারের ভিতরেই স্বাধীনতা খুঁজে পায়। এটি তাদের জন্য মানসিক চাপ নিরাময়ের একটি উপায় হলেও অনেকের জন্য কারাগারে যাওয়াটা অনেক হতাশাজনক। বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কি আমাদের হতাশাগ্রস্ততা করা এবং কারাগারে প্রেরণের জন্য দায়ী? এই স্বেচ্ছাসেবী কারাবাস কি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে?

ইংরেজিতে পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Probin Islam

The administrator and contributor of the contents is a writer, reader and researcher of passion.

This Post Has One Comment

Leave a Reply